সূর্য ও নক্ষত্র…

আমাদের নিকটতম নক্ষত্র আমাদের পরম সৌভাগ্য মহাকাশ আমাদের হাতের কাছে একেবারে তৈরি চমৎকার সুন্দর একটি ল্যাবরেটরিকে আমরা পেয়ে গিয়েছি-নক্ষত্রদের ঘরসংসারের খবরাখবর সংগ্রহের কাজে যে আমাদের বিপুল ভাবে সাহায্য করেছেন। পরীক্ষাগারটি হল সূর্য-আমাদের তারাজগৎ ছায়াপথের (মিলকি ওয়ে) দশ হাজার কোটি নক্ষত্রের মধ্যে একটি নক্ষত্র। সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব হল ১৪,৯৫,০০,০০০ কিঃ মিঃ । সূর্যের ব্যাস হল ১৩,৯৩,০০০ কিলোমিটার-পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯.৩০ গুণ সূর্যের আয়তনের মধ্যে স্বচ্ছন্দে তের লক্ষ পৃথিবীর জায়গায় হতে পারে। সূর্যকে ঘিরে আমাদের অগনিত প্রশ্ন। সূর্যের জন্ম হল কিভাবে, সূর্যের তেজভাগেুর ভেতরের রহস্যটাই বা কি, সূর্য কি চির দিন কি বেচে থাকবে, সূর্যের ভাবষ্যৎ কি, সূর্যের মৃত্যু কি আসন্ন? সূর্যস্বন্ধে আমাদের মাথাব্যাথা কারণ হল পৃথিবীর সমস্ত জীবজগতের অস্তিত্বই ওর ওপরে নির্ভর শীল। সূর্যের আলো এবং তাপকে বাদ দিয়ে আজ থেকে আনুমানিক আড়াইশ’ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সেই আদি সমুদ্রের জলে প্রথম এককোষী প্রাণসৃষ্টির পরীক্ষাকাজ সম্পূর্ণই হয়ে উঠত না। প্রাণের বিবর্তন প্রক্রিয়াও স্তবব্ধ হয়ে যেত। এপ্রবন্ধে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের হবেষণার দৃষ্টিতে সূর্য স্বম্বন্ধে মোটামোটি একটি ধারণা করার চেষ্টা করব। সূর্যের ভেতরের চেহারাটা খোলা চোখে নয়, ওয়েলডিং-এর কাজ করার চশমা বা পুরোপুরি কালো দুটি ফটোগ্রাফি ফিল্মের মধ্যে দিয়ে সূর্যের দিকে তাকালে গোল বলের মত ক্ষেত্রটির যে পৃষ্ঠভাগ আমাদের চোখে পড়ে, সে হল ওর আলোকমন্ডল বা ফোটোসফিয়ার। সূর্যের বায়ুমন্ডলের এটা হল প্রথম স্তর, এর তাপমাত্রা হল ১১০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এখানে গ্যাসীয় বস্তুর ঘনত্বও খুবই কম। কিন্তু যত সূর্যের অভ্যন্তরে নামা যাবে, তত গ্যসীয় বস্তুর তাপ ও ঘনত্ব বাড়তে থাকবে। সূর্যের কেদ্রের ঘনত্ব হল জলের নব্বই গুণ, লোহার বার গুণ। ওখানে গ্যাসীয় বস্তুও রয়েছে ইস্পাতের মত শক্ত কঠিন অবস্থায়। সূর্যের তাপের পরিমাণ হল আড়াই কোটি ডিগ্রি ফারেনহাইটির কাছাকাছি। সূর্যের মূল উপাদান হল হাইড্রোজেন-পরিমাণে শতকরা ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ; শতকরা ১৫ ভাগ হল হিলিয়াম এবং বাদবাকি অন্যান্য উপাদান। প্রায় ১০০ কোটি হাইড্রোজেন বোমা একসঙ্গে ফাটলে অবস্থাটা যা দাঁড়াবে, সূর্যের চেহারাটা হল ঠিক তাই। তবে ওখানে সব ব্যাপারটাই রয়েছে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। আলোকমন্ডলের ওপরে হল সূর্যের বায়ুমন্ডলের দ্বিতীয় স্তর বর্ণমন্ডল বা ক্রোমোসফিয়ার অঞ্চল। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় যে দুটো ঘটনা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে, তাদের একাট হল সৌরোচ্ছ্বাস-বর্ণমন্ডল অঞ্চল থেকে বিদ্যুতের ঝলকের মত এক একটি গ্যাসের উচ্ছ্বাস হল এরা। এর ফলে তৈরি হয় প্রোটণ কণিকার স্রোত, যার আর এক নাম হল সূর্যের বাতাস-এরই কিছু অংশ ছুটে আসে পৃথিবীর দিকে। দ্বিতীয়টি হল সৌরোৎক্ষেপ-আলোকমন্ডল থেকে হাইড্রোজেন কণিকা ও গ্যাস বিরাট শিখার আকারে লক্ষ কিলোমিটাওররও বেশি ওপরে উঠে আসে। বর্ণমন্ডলের ওপরে হল সূর্যের কিরীটিকা বা করোনা অঞ্চল-গ্যাসের এক বিরাট উত্তরীয় বা চাদরের মত কোটি কোটি কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। বৈজ্ঞানিক মত অনুযায়ী পৃথিবীও নাকি এই করোনা প্রভাবিত অঞ্চলেই অবস্থান করেছে। সূর্যের আলোক মন্ডল থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ আলো ও তাপের দুশো কোটি ভাগের এক ভাগ মাত্র পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। আর তার ফলে পৃথিবীর জল ও মাটির এলাকা জুড়ে প্রাণের এত বিচিত্র সমারোহ। যে আলো আজ এই মুহূর্তে পৃথিবীতে এসে পৌছল তার বয়েস হল দশ লক্ষ বছর। সূর্যের কেন্দ্র থেকে আলোরূপী ঐ শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল গামা ও রঞ্জন রশ্মির আকারে। তার পর সূর্যের কেন্দ্রমন্ডলের বিপুল চাপ যুক্ত অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে পথ তৈরি করে সূর্যের পৃষ্ঠভাগ পর্যন্ত ও পৌঁছতেই ওর ওই বিপুল পরিমাণ সময় পার হয়ে বসে আছে। ওর চেহারাটা তখন কিন্তু একেবারেই পাল্টে গেছে; গামা ওরঞ্জন রশ্মির রূপ দাঁড়িয়েছে অতিবেগুনী, অবলোহিত প্রভৃতি আলোতে। কাজেই যখন সূর্যের টাটকা, তাজা আলোয় গা ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বলে ভাবছি, তখন দশ লক্ষ বছরের পুরনো বাসি আলোটাই কিন্তু গায়ে লাগছে। পৃথিবীর মাত্র ৩২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় যে পরিমাণ সূর্যের আলো এসে পড়ছে, তাকে পুরোপুরি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে তা দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর সারা বছরের বিদ্যুৎশক্তির চাহিদা মিটাতে পারে। আমাদের বৈজ্ঞানিক সভ্যতার উন্নতির মান আজও কিন্তু এই পর্যায়ে পৌঁছইনি যাতে বিদ্যুৎশক্তি তৈরির এই বিরাট সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারি। সৌরকলঙ্ক সূর্যের বুকে মাঝে মাঝে কতগুলো নাটকীয় ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। হঠাৎ দেখা গেল সূর্যের পৃষ্ঠভাগের ওপর কালো কালো ছোপ ছোপ অনেক গুলো জায়গা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যাদের নাম দেওয়া হয়েছে সৌরকলঙ্ক। আগেরকার দিনে মানুষ ভাবত সূর্যকে দানোয় পেয়েছে, আবার কেউ ভাবত সূর্যের ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে। এমকি স্বয়ং গ্যালিলিও, যিনি পৃথিবীর প্রথম দূরবীণ যন্ত্র তৈরি করে তার মধ্য দিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে ঐ কালো জায়গাগুলো দেখেছিলেন, তিনিও ভেবেছিলেন ওরা সূর্যের বুকে বসানো বিরাট কতগুলো কালো গর্ত। আসল ব্যাপারটা অবশ্য গ্যলিলিও জানার কথা নয়। বর্তমানে আমরা জানি, ওদের কালো দেখানোর কারণ সূর্যের পৃষ্ঠভাগের (তাপমাত্রা ১১০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তুলনায় ওদের তাপমাত্রা হল ৩০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট কম। ওরা কিন্তু স্থির হয়ে বসে থাকে না। সূযের দেহের ওপর দিয়ে ওরা ঘুরে চলে। প্রতি এগার বছর অন্তর অন্তর ওদের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়ে উঠতে দেখা যায়। একে বলে সৌরকলঙ্ক চক্র। একটি বৈজ্ঞানিক মত হল, সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে কোন অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফলেই সৌর কলঙ্কদের সৃষ্টি হচ্ছে। এরা যেন সূর্যের বুকে বসানো বিরাট বিরাট পিচকিরির মুখযাদের মধ্য দিয়ে সূর্য মহাকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন রাশ্মি ও সৌরকণিকা স্র্রোত। বায়ুসন্ডলের সঙ্গে এদের সংঘাত সৃষ্টি হবার পর সারা পৃথিবী জুরে নানা ধরনের পরিবর্তনের খেলা শুরু হয়ে যায়। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র হয়ত দেখা গেল হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠছে। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশ পর্যন্ত বেতারবার্তার আদান-প্রদান ব্যবস্থা হঠাৎ বন্ধ হয়ে বসল। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক যে কত নিবিড়, এইসব ঘটনা তারই পরিচয় বহন করছে। সূর্যের সৃষ্টি বিজ্ঞানীদের অনুমান, আজ থেকে বহু কোটি বছর আগে ধুলোকণা এবং হাইড্রোজেন ও অন্যান্য গ্যাসীয় কণায় তৈরি বিরাট বড় বড় মেঘ মহাকাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। মেঘের মধ্যে ধলো ও গ্যাসীয় কণাগুলো কিভাবে জড়ো হতে শুরু করেছিল, তার সঠিক ধারণা করা মুসকিল। কারোর মতে চাপে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়। ধুলো ও গ্যাসীয় কণারা জড়ো হতে হতে যখন বড় একটি পিন্ডের আকার নিল তখন শুরু হল অভিকর্ষ বলের খেলা। অভিকর্ষে প্রভাবে এরপর গড়ে ওঠার পালাটা এগিয়ে চলল আরও দ্রুতগতিতে। এভাবে জড়ো হতে হতে সূর্যের সমপরিমাণ আয়তনের একটি বস্তুপিন্ডের মধ্যে যখন আমাদের পৃথিবীর প্রায় ৩,৪০,০০০ গুণ বস্তুর সমাবেশ ঘটল, তখন আভ্যন্তরীন প্রচন্ড তাপে মুহুর্তের মধ্যে ঐ সমগ্র বস্তু গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে প্রচন্ড দীপ্তশীল একটি নক্ষত্রকে সৃষ্টি করে বসল। এ জাতীয় একটি ঘটনার জন্যে ঐ নক্ষত্রের কেন্দ্রের তাপ আড়াই থেকে তিন কোটি ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছন দরকার। এত প্রচন্ড তাপে পদার্থ গ্যাসীয় রূপেও থাকতে পারেনা-তার রূপান্তর ঘটে আয়নিত অবস্থায়। এ জাতীয় একটিপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আজ থেকে আনুমানিক পাঁচশ কোটি বছর আগেসৃষ্টি হয়েছিল আমাদের সূর্যের। সৃষ্টিলাভ করেছিল আরও অসংখ্য নক্ষত্র। অসংখ্য কোটি নক্ষত্রদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক একটি তারাজগৎ। আলোর মালায় ভরে উঠেছিল নিকষ কালো মহাকাশের অঙ্গন। একটি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিপুল তাপশক্তির রহস্য জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হানস্ বেথে প্রথম উদঘাটিত করেন। বেথের মতে তাপ-পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়াই এই তাপশক্তির মূল কারণ। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটি নক্ষত্র কেন্দ্রে চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু মিলে একটি হিলিয়াম পরমাণুকে সৃষ্টি করছে এবং এই প্রক্রিয়া প্রতি মুহুর্তে ঘটছে অসংখ্য কোটি পরিমাণে। পদার্থের এই রূপান্তরের সময় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ০.৭ ভাগ পরিমাণ ভর শক্তিতে ভোল পালটে বসছে। পদার্থের ভর কে যে শক্তিতে রূপ দেওয়া যায় এবং শক্তিকেও রূপান্তরিত করা যায় পদার্থের ভরে, এ কথা মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টান ১৯০৫ সালে সর্ব প্রথম তার বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বলেছিলেন। আইনস্টানের সূত্র অনুযায়ী সূর্যের কেন্দ্রে ব্যাপারটা কি ঘটছে দেখা যাক। সেখানে নাকি প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪০ লক্ষ টন হাইড্রোজেনরূপী গ্যাসীয় বস্তু ৫৬০০০ লক্ষ টন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। অর্থাৎ ঘটনাটা দাড়াচ্ছে, এই সূর্যের দেহ থেকৈ প্রতি সেকেন্ডে ৪০ লক্ষ টনের মত হাইড্রোজেন বস্তু শক্তি বা বিকিরণের আকারে খোয় যাচ্ছে। আর তার ফলেই না সূর্যের বা তাপের এত জৌলুষ। অনেকে আবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভাবতে পারেন সূর্য, ভয়ানক তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা অবশ্য বলেছেন, সূর্যের সৃষ্টি যদি আনুমানিক পাঁচশ কোটি বছর আগেও হয়ে থাকে, তাহলে সূর্য এ পর্যন্ত ওর মোট হাইড্রোজেন সঞ্চয়ের শতকরা মাত্র একভাগ খুইয়েছে। বাদবাকি এখনও মজুত আছে।